শহীদ ছাত্রনেতা নজরুলের মুক্তিযুদ্ধ

0 45

বাশার খান

মুক্তিযুদ্ধকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামের ৫০তম শহীদ দিবস আজ। শহীদ নজরুল ইসলামের জন্ম ১৯৪৮ সালে, কুমিল্লার দাউদকান্দির সুন্দলপুর গ্রামে। বাবার নাম আবদুল আজিজ সরকার। নজরুল ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এর আগে ঢাকা কলেজে পড়াকালীন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের জিএস হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। ছাত্ররাজনীতি এবং বাঙালির মুক্তির আন্দোলনে সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে অল্পসময়ে নজরুল সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শীর্ষ ছাত্রনেতাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি।

১৯৬৯-এর ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে দুঃসাহসী ভূমিকা রাখেন নজরুল। আইয়ুব খান সরকারের পুলিশের হাতে দুইবার গ্রেপ্তারও হন। ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালীন আন্দোলনে সক্রিয় থাকার অপরাধে তাকে ১৪ বার ‘শো-কজ’ করা হয়। কিন্তু নজরুল তার লক্ষ্যে ছিলেন অবিচল। গ্রেপ্তার, জেল-জরিমানা, এমনকি ফাঁসির দন্ড হওয়ার মতো কাজেও ছিলেন নির্ভীক। বর্তমানে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য এবং সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিমের স্মৃতিকথায় এমনই তথ্য পাওয়া যায়। লেখাটি ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর দৈনিক বাংলার বাণী’র ‘বাংলাদেশে গণহত্যা’ শীর্ষক বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। শেখ সেলিম লেখেন, ‘১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু আগরতলা মামলার আসামি হওয়ার পর আমরা একটা লিফলেট বের করলাম। লিফলেট বিলি করার দায়িত্ব পড়ল নজরুলের ওপর। বাংলাদেশে তখন ত্রাশের রাজত্ব বিরাজ করছিল। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস কেউ রাখত না। সে মুহূর্তে লিফলেট বিলি করার সাহসী ছেলে খুব কমই ছিল। ধরা পড়লেই মৃত্যুদন্ড। নজরুল গুলিস্তান থেকে বাসে উঠে নিউ মার্কেট পর্যন্ত এ গুরুদায়িত্বের ভার গ্রহণ করেছিলেন।’ নজরুল ছিলেন বেশ লম্বা। মিছিলে সবার ওপরে দেখা যেত তার মাথা। কণ্ঠ সু-উচ্চ। মিছিলের অগ্রভাগে থেকে স্লোগান ধরতেন। স্লোগানে নজরুলের বজ্রকণ্ঠ সম্পর্কে শেখ সেলিম লিখেন, ‘ … প্রতিটি সভা-মিছিলে নজরুলকে সামনের কাতারে দেখা গিয়েছে। তার স্লোগানে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠত। শুধু স্লোগানই নজরুল দিতেন না, প্রতিটি আন্দোলনে সবসময় তিনি অগ্রভাগে থাকতেন।’

১৯৭১ সালের ১ মার্চ, ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বেতার ভাষণের মাধ্যমে স্থগিত করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে ঘর-বাড়ি ও সরকারি-বেসরকারি কর্মক্ষেত্র থেকে বাঙালিরা রাস্তায় নেমে আসেন, বিক্ষোভে উত্তাল পুরো ঢাকা। শহরের সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি তখন ঢাকা স্টেডিয়ামে চলা বিসিসিপি ও আন্তর্জাতিক একাদশের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ ফেলে দর্শকরা স্টেডিয়াম থেকে বের হয়ে মিছিলে অংশ নেন। মিছিলগুলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে নির্দেশ লাভের জন্য মতিঝিলে হোটেল পূর্বাণীর দিকে অগ্রসর হয়। বিক্ষোভে অগ্নিরূপী জনতা স্লোগান দেয়, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। আর কোনো আলোচনা নয়, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উত্তপ্ত ঢাকার রাজপথ। তাই ইয়াহিয়ার ওই বেতার ভাষণ বাঙালিদের কাছে মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলে। কারণ বাঙালিরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন যে, ৩ মার্চের অধিবেশনে জনরায়ে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু ইয়াহিয়ার এই ঘোষণার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না বাঙালিরা। এর মাধ্যমে পূর্বপাকিস্তানের শাসনভার বাঙালিদের হাতে তুলে না দেওয়ার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রে উপনীত হন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এ সময় মুক্তিপাগল বাঙালি জাতি যখন অগ্নিরূপী, তখন ঢাকা শহরে মিছিলে-স্লোগানে নেতৃত্ব দেন নজরুল। একদিন ভাগ্যক্রমে নিশ্চিত মৃত্যু থেকেও বেঁচে যান। এই তথ্য জানা যায় শেখ সেলিমের স্মৃতিতে, ‘পাকিস্তান সরকার যখনই কারফিউ দিয়েছে নজরুল সেই কারফিউ ভঙ্গ করার নেতৃত্ব দিয়েছেন। একদিনের ঘটনা বলি। ইয়াহিয়া সরকার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ভেঙে দেওয়ার পর বাংলাদেশে যখন বিক্ষোভের আগুন বইছিল, তখন উপায় না দেখে কারফিউ জারি করা হলো। নজরুল ফজলুল হক হল থেকে মিছিল নিয়ে কারফিউ ভঙ্গ করলেন। যখন বলাকা সিনেমার কাছে মিছিল পৌঁছল তখন মিছিলের ওপর গুলি চালানো হলো। নজরুল সেদিন সামান্যের জন্য মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। এমনই দুঃসাহসিক কাজ তিনি সবসময় করতেন।’

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দ্বারা নিরীহ বাঙালিদের ওপর বর্বর আক্রমণ ও গণহত্যা পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে, নজরুল চলে যান ভারতের আগরতলায়। সেখানে প্রশিক্ষণ নেন। দেশে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। গোপনে ঢাকায় ছাত্রদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণের জন্য আগরতলা দিয়ে আসতে শুরু করেন। যেতেন দাউদকান্দিতেও। সেখানকার ছাত্র-যুবকদেরও ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে কৌশলে সীমান্ত পার করে ভারতে নিয়ে যেতেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্র-যুবকদের দেশে এনে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গেরিলা দলে সরবরাহ করতেন। পরে বিএলফ (বাংলাদেশে লিবারেশন ফোর্স বা মুজিব বাহিনী) গঠিত হলে নজরুল দাউদকান্দি থানার কমান্ডার নিযুক্ত হন। একাত্তরের রমজান মাসে ২৭ অক্টোবর ১৯৭১, তৎকালীন মোহাম্মদপুর থানার দারোগা সিরু মিয়া, তার ছেলে কামাল, বিএলএফ কমান্ডার নজরুলসহ ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার তালেব নামে এক রাজাকারের বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়েন। নজরুল ও সিরু মিয়া দারোগা ধরা পড়েন রিভলবারসহ। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলে। সেদিন বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে স্থানীয় রাজাকাররা মাইকে প্রচার করে, ৬ জন দুর্ধর্ষ দুষ্কৃতকারী ধরা পড়েছে। মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য বের করার জন্য জেলে বন্দি নজরুলের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু নজরুলের শরীর যেন হয়ে ওঠে পাথরের মতো। তাকে শত নির্যাতনের পরও কোনো তথ্য বের করতে পারেনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। নজরুলের সঙ্গে জেলবন্দি থাকা মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহিউদ্দিন হায়দার খোকা জানান, ‘নির্যাতনে নজরুল অজ্ঞান হয়ে পড়েন। নজরুলসহ তাদের গরম লোহার সেঁঁক দেওয়া হতো। অমানবিক নির্যাতনে নজরুলের দেহ হাড্ডিসার হয়ে গিয়েছিল।’

মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত আসামি শীর্ষ রাজাকার গোলাম আযমের বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগে উল্লেখ ছিল নজরুল, সিরু মিয়া দারোগাসহ ৩৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার ঘটনা। সেই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম সাক্ষী ছিলেন নজরুলের সঙ্গে জেলে থানা প্রয়াত জনপ্রিয় সুরকার ও গীতিকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ঈদের রাতে নজরুলসহ ৩৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার ঘটনার করুণ বর্ণনা ছিল, আদালতে দেওয়া আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘…তাকে (নজরুলকে) একদিন পালিয়ে যেতে বললে তিনি আমাকে মারধর করে বলেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধারা পালাতে শেখেনি। এখান থেকে ফুলের মালা গলায় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা একদিন আমাদের মুক্ত করে নিয়ে যাবে। … (হত্যার জন্য জেল থেকে বের করে নেওয়ার সময়) আমি নজরুল ভাইয়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, আপনি তো পালিয়ে গেলেন না। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, আমার কিছু বলার নেই রে। এই লুঙ্গিটা আমার মায়ের কাছে পৌঁছে দিস।… আমি চাদর দিয়ে প্রত্যেকের চোখের পানি মুছে দিয়েছিলাম।’ (banglanews24.com)। এরপর ২১ নভেম্বর ১৯৭১, ঈদের দিন গভীর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পৈরতলা রেলসেতু সংলগ্ন খালপাড়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয় নজরুলসহ ৩৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে। শহীদদের লাশ ফেলা দেওয়া হয় পৈরতলা খালে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে তরুণ প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেম বোঝার, জানার ও ধারণ করার অন্যতম পথ মহান মুক্তিযুদ্ধে নজরুল ইসলামদের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের ঘটনা। ৫০তম শহীদ দিবসে জাতির সূর্যসন্তান শহীদ নজরুল ইসলামের অনবদ্য অবদান ও স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক

basherkhandu@gmail.com

সূত্র : https://www.deshrupantor.com/editorial-news/2021/11/21/328604.

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.